conveylive.com

শিকড়

A Story of A Brother

Tina S
Tina S
Dec 10, 2009
0 Comments | 4596 Views | 2 Hits
Rating: 5 Tina S , শিকড় Tina S , শিকড় Tina S , শিকড় Tina S , শিকড় Tina S , শিকড়
Literature


বই পড়ে সময় আর সময় কাটতে চায় না। এত বই পাবো কোথায়। পুরানো  বইগুলোকে বার বার পড়ি। বেকার সময় কাটানো আসলেই দুঃসহ ব্যাপার।পরীক্ষা শেষ হলো মাত্র একমাসও হয়নি এখনই হাপিয়ে উঠেছি। আরও দুই/তিন মাস এভাবেই থাকতে হবে।

কলেজে পড়ার সময় অবসর বলে কি কিছু ছিল তা মনে পরে না।সকালে ক্লাস বিকালে স্যারের বাসা, আরও অনেক আলতু ফালতু কাজ করে সময় যে কন দিক দিয়ে ছলে জেত তা টেরি পেতাম না। এখন কলেজের বেশির ভাগ ছাত্রী ঢাকায়।আমারও ইচ্ছা ছিলো যাওয়ার তা আর হলো কই।

আমার আব্বার বিশ্বাস ঢাকায় গেলে আমিও ভাইয়ার মত কিছু একটা করব। আজ আড়াই বৎসর হলো ভাইয়াটাকে দেখি না। কোথায় আছে,কিভাবে আছে তাও জানি না। শেষ শুধু একবার ফোনে কথা শুনেছি তাও তিন/চার মাস আগে। আমাদের এলাকার আশেপাশে কোন ফোনের দোকান নেই। ফোন করতে হলে রিকশা নিয়ে উত্রাইল যেতে হয়। ভাইয়া যেই মোবাইল নাম্বারটা দিয়াছিলো তাই নিয়া একদিন গেলাম,কথাও হলো ভাইয়ার সাথে। বলেছিলো, ৬ সেপ্টেম্বর আসবে।কিন্তু এলো না,আমিও আর ফোন করতে পারি নি।আব্বা জেনে ফেলেছিল সেদিন,এরপর থেকে ঘর থেকে আমায় তেমন ছাড়ে না কোথাও।খুব দরকার হলে আমার সাথে হীরাকে পাঠায়। হীরাটা বদের বদ। সব কথা আব্বাকে না বললে অর পেটের ভাত হজম হয় না। আম্মার জন্য কষ্ট হয়। একমাত্র ছেলে আজ ছন্নছাড়া। যাকে নিয়ে একসময় হাজার স্বপ্নের সুতা বুনে গেছেন সে আজ নেতাগিরি করে ঘুরে বেরাচ্ছে।

ছাত্র হিসেবে আমাদের এই জেলায় ভাইয়ার অনেক সুনাম ছিলো।উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভাইয়া মেধা তালিকায় ময়মনসিং বোর্ড থেকে ৪র্থ হয়। আব্বা চেয়েছিলেন ভাইয়াকে আনন্দমোহন কলেজে পড়াবেন কিন্তু এই সাফল্য আব্বাকে অন্য স্বপ্ন দেখায়। তারপর ভাইয়াকে  ঢাকায় পাঠালেন। তখন আমি নাইনের ছাত্রী কিন্তু তাও বুঝতাম ভাইয়াকে পড়ানর জন্য আম্মা-আব্বা চেষ্টার কোন ত্রুটি করেন নি। যখনি টাকা চেয়ে পাঠাচ্ছে তখনি তা দেয়া হচ্ছে। হিসাব করে দেখা যেতো ভাইয়ার মাসিক খরচ দিন দি বাড়তে থাকলো।কিন্তু কখনো প্রশ্ন উঠতো না যে এত টাকা ভাইয়ার কেন লাগছে। ভাইয়ার ঠিকানা ঘন ঘন বদল হতে থাকলো। পুত্র প্রেমে অন্ধ আমার প্রিয় আব্বা-আম্মা কখনোই এইসব নিয়া ভাইয়াকে কিছু বলতেন না। এভাবেই চলে গেলো ভাইয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুল্যবান দুটি বছর।

ঘটনাটি ঘটলো ডিসেম্বর মাসে। মনে আছে সেদিন সকাল থেকে কারেন্ট ছিলো না। আমার টেস্ট পরীক্ষা চলছিল তাই রান্নাঘরে কুপিবাতি দিয়া পরছিলাম।আম্মা পাটশাক ভাজি করছিলেন,শুকনো মরিচের গন্টা নাকে যেতেই কাশি আসছিলো। তখনি ভাইয়ার কথা মনে হলো, ও পাটশাক খেতে পছন্দ করতো। আমি খেতাম না দেখে পুইশাক বলে প্রায়ই বোকা বানাতো। এসব ভাবছি ঠিক তখনি উঠানে কেউ এসে আব্বাকে নাম ধরে ডাকছে বলে মনে হলো। আব্বা পোষ্ট অফিসে গেয়েছেন ভাইয়ার চিঠির খোঁজে অনেকদিন চিঠি আসছিল না। আমি আর আম্মা দুজনেই হারিকেন নিয়ে উঠানে আসলাম। ধক করে বুকের ভিতর একটা চাপ ,একটা আতংক অনুভব করলাম। চারজন পুলিশ দারিয়ে আছেন,হাতে অনেক কাগজপত্র আছে।কাছে জেতেই একজন বললো যে,তারা ঢাকা থেকে অরদের পেয়েছেন যে মোহাম্মদ নাসির একজন পলাতক খুনের আসামি,সে যখনি তার বাড়ি আসবে তাকে যেনো গ্রেফতার করা হয়।

মোহাম্মদ নাসির মানে আমার ভাইয়া যাকে আম্মা খোকা বলে ডাকে।ভাইয়া খুনের আসামি হবে কেনো।মনে হয় একই নামের অন্য কাউকে হয়ত খুঁজছে। আমি সাহস করে বললাম “আমার ভাইয়ের নামও মোহাম্মদ নাসির কিন্তু ও ঢাকায় পড়াশোনা করে,আপনি মনে হয় ভুল করছেন।আমার কথা শেষ হতে না হতেই আব্বাকে দেখলাম। এরপর আব্বাই এগিয়ে গেলেন।আব্বাকে ওরা ভাইয়ার ছবি লাগানো কিছু কাগজ দেখালো।আব্বার মুখখানা ধীরে ধীরে কঠিন হতে থাকলো।

আমার আব্বা একজন অতি সাধারন মানুষ,যিনি স্বপ্নেও দেখেন সাধারন ভাবে। তাঁর এই অতি সাদাসিধে জীবনে আজ এসে দাড়ালো এক কঠিন পরীক্ষ। আব্বা তাদের আশ্বস্ত করলেন এবং কথা দিলেন ভাইয়া বাড়ি আসলে তাদের খবর দেয়া হবে।

সেদিনকার ঘটনা এই এইটুকুই। ভাইয়াকে কেন পুলিশ খুঁজছে, ভাইয়াকে কেন খুনি বলা হচ্ছে তার কিছুই জানা গেলো না। আব্বা আমাদের কিছুই বলেন নি।সেই দিন থেকে আব্বার মেজাজ সব সময় খারাপ থাকতো।অকারনেই রেগে জেতেন। আম্মার কাছে একদিন সাহস করে জান্তে চাইলাম। আম্মা যা বললো তা না জানলেই ভাল হতো।ভাইয়া নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়া রাজনীতি করা শুরু করে।দীর্ঘদিন রাজনীতির সাথে সে জরিত।পড়াশোনা তেমন করেনি। তারপর অন্য দলের কাউকে খুন করে এখন পালিয়ে বেরাচ্ছে। আম্মার কথাও খুব পরিস্কার না। কেন শুধু শুধু ভাইয়া কাউকে খুন করবে?
সে সময় আই প্রশ্নের কোন উত্তর পাই নি।

 

ভাইয়ার একটা চিঠি আসে। সেই চিঠি আব্বা আমাদের কাউকেই পড়তে দেন নি।একদিন আমি লুকিয়ে সেটা পড়ে ফেলি।সেখান থেকে একটা নম্বর পাই।অনেক কষ্টে ফোন দেই।ভারি গম্ভীর কন্ঠ হ্যালো বলে,ভাইয়া চাইতেই তিনি জানান এখানে এই নামে কেউ থাকে না।আমি আবার বললাম,আমি নাসিরের ছোট বোন।এবার কাজ হলো,ভাইয়া ফোন ধরলো।ভাইয়া বললো, সে ভাল আছে। তাকে মিথ্যাখুনের মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এই সমস্যার সমাধান হলেই ভাইয়া বাড়ি আসবে।আম্মা। আব্বার কথা জানতে চাইলো। দুই-তিন মাসের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে বললো।হলোও তাই,দুই মাসের মাথায় ভাইয়া বাড়ি এলো,চন্দনের মতো গায়ের রঙ ছিল ভাইয়ার এখন তা দেখে বোঝার উপায় নেই। আব্বা তখন বাড়ি ছিলেন না,আব্বা এসে ভাইয়া দেখলে নিশ্চই খুশি হবেন। না,এতা আমার ভুল ধারনা প্রমান করলেন তিনি। আব্বা বাড়ি এসে ভাইয়াকে দেকে বললেন ভাইয়া যেন সকালেই ছলে যায় এবং আর কখনই যেন আমাদের সাথে যোগাযোগ না রাখে।

সেই রাতে অল্প সময়ের জন্যই দেখেছি ভাইয়াকে,সে এখন একটা মোবাইল ব্যবহার করে। কথা থেকে কিনেছে জানতে চাইলে বললোসে নাকি কি কাজ করে বড় বড় নেতাদের তারাই নাকি ভাইয়াকে বেতন দেয়।বুঝলাম ভাইয়া ছাত্রনেতা টাইপ কিছু একটা হয়েছে। এই ভাইয়া যে দুবছর আগে ঢাকায় যাওয়া সেই ভাইয়া তা বোঝাই যায় না। ছাত্ররাজনীতি ভাল না এই কথাটা ভাইয়াই আমাকে বলতো।তার থেকেই আমার প্রথম শোনা। আজ সেই এর শিকার।পরদিন সকালে উঠে ভাইয়াকে সালাম করি,ও আমাকে ৫০০ টাকার একটা নোট দিতে চায়,আমি নেই নি,আব্বা জানলে কষ্ট পাবেন।
এরপর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের বাসায় ভাইয়ার নাম কেউ তুলে না। আম্মা তার নাড়িছিড়া আদরের পুত্রের জন্য শোকও করতে পারেন না। এভাবেই কেটে যেতে থাকলো দিন,মাস।সগে তাও লুকিয়ে ভাইয়া খবর নিতাম এখন তাও নেই না।

আমার উচ্চ মাধ্যমিকের ফল বেরুলো। ভাইয়ার মত আমার রেজাল্টও ভাল হল। আমাকে নিয়ে আব্বা বিপদে পরলেন,আমাদের এখানে কোন কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় নেই। পড়তে হলে ঢাকা বা ময়মনসিংএ যেতে হবে। আব্বা সাহস পাচ্ছেন না। আতংক,ভয়,নানা রকম দুঃশ্চিন্তা তাঁকে ঘিরে ধরেছে। আমি আব্বাকে আশ্বস্ত করলাম আমি সাবধানে থাকবো বলে। তাও তাঁর মন মানে না। ঢাকা যাওয়ার প্রচন্ড ইচ্ছাকে মাটি চাপা দিলাম আমি।

অনেক বিবেচনার পর ময়মনসিংই ঠিক হলো। কলার ছাত্রী হেসেবে অর্থনীতিতে স্নাতক করবো ঠিক করলাম। কলেজ জীবন ভালভাবেই শুরু হলো। ক্লাসমাটরা সবায় আন্তরিক ছিল। এই কলেজেও রাজনীতি আছে। ছাত্রছাত্রীরা প্রায়ই মিছিল করে,মিটিং করে।পুলিশি ধাওয়া,ছাত্র-শিক্ষক বিরোধ এখানকার নৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব থেকে দূরে থেকে পড়াশোনায় মন লাগাই আমি। প্রায়ই ভাইয়াটাকে মনে হতো। তার দেওয়া মোবাইল নম্বরটাতে আর লাইন যায় না। এখন আর চিন্তাও করি না। অভ্যাস হয়ে গেছে সব কিছু। ১ম বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষার আগে আমার রুমমেট ঝুমুরের মোবাইলে আব্বার ফোন আসে।আব্বা আমাকে এখনি বাড়িতে রওনা দিতে বলেন। আমি বুঝলাম না কি এমন হলো যে আমায় এত ডাকা হচ্ছে। আব্বা জানেন আমার পরশু থেকে পরীক্ষা, এই পরীক্ষা না দিলে এক বৎসর নষ্ট হবে, তাও তিনি যেতে বলছেন, তার মানে আসলেই খুব জরুরি।

খুব দ্রুত কিছু জিনিস একটা ব্যাগে নিয়ে রুম থেকে বের হলাম। এখান থেকে বাড়ি যেতে দুই ঘন্টা লাগে। বাসটা মনে হয় ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। তর সইছে না একটুও।কি হলো বাড়িতে? মনটা অস্থির লাগছে। আম্মার কিছু হলো না ত, না না কি সব ভাবছি। গত পরশুদিন আম্মার সাথে কথা হলো, দুইজন লোক লাগিয়ে আম্মা চালের গুড়ি করাচ্ছেন। পরীক্ষার পর বাড়ি গেলে পিঠা বানাবেন। আম্মাকে তো সুস্থই মনে হলো।বারিতে আর কে আছে,হীরা আছে আব্বার সাথে দোকানে বস, আম্মার কাজটাজ করে দেয়,ওর বয়সের একটা ছেলের কি হবে। হঠাৎ জোরে ব্রেক কষলো বাসটা, আমার চিন্তায় ছেদ পড়লো। এক্তা পত্রিকা কিনলাম,আজ পত্রিকা পড়তে মন বসাতে পারছি না। চালভাজা কিনলাম এক প্যাকেট, তাও খেতে পারছি না, হীরাকে দেবো এই ভেবে ব্যাগে রাখলাম।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাস থামলো। রিকশা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। রকশা বাড়ি পর্যন্ত যায় না, অর্ধেক নেমে পায়ে হেটে যেতে হয়। অনন্তদের জমি পাড় করে হাটার গতি বাড়ালাম। বাড়িটা দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। জবাফুলগুলো  টকটকে লাল হয়ে ফুটেছে। অনেক মানুষ দেখা যাচ্ছে আর হাটতে পারলাম না দৌড় দিলাম বাড়ির দিকে। গেটের কাছে আগর বাতির তীব্র গন্ধ নাকে লাগলো। ভিতরে ঢুকতেই আম্মাকে দেখলাম,তাহলে আম্মার কিছু হয়নি। আম্মার পাশে সাদা কাপড় দিয়া মোড়ানো কিছু একটা পড়ে আছে, বুঝতে দেরি হলো না ওটা একটা লাশ, তার মানে কেউ মারা গেছে। আমি এগিয়ে আম্মার যাচ্ছি আম্মার দিকে, এতক্ষনে আব্বাকে দেখলাম, লাশের পাশে বসে আমাকে হাত দিয়ে ডাকছেন। এগিয়ে এসে বসলাম আমি, আব্বা আদর করে বললেন, “একটুও কাদঁবে না। তোমার ভাইয়া মারা গাছেন।“ আব্বার কথার উর্ধে উঠবো না কখনো কিন্তু পারলাম না, দু’চোখ মানলো না।

 

চিরনিদ্রায় শায়িত ভাইয়ার মুখটা কি শুভ্র দেখাচ্ছে আজ। মনে হচ্ছে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে আমার অতি প্রিয় ভাইটি। আব্বার মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। এক বুক আশা ছিলো ছেলেকে নিয়ে, আশা ভঙ্গ মানুষকে দেখতে  অনেকটা শুকনো গাছের মত মনে হয়। সেই গাছের পাতা সারা বছরই ঝরে পড়ে। বৃষ্টির জন্য সে গাছ আর হাহাকার করে না, পাছে ঝড় চলে আসে আর নিভিয়ে দেয় শেষ অস্তিত্বটুকু।

Shormy, 2006.

 

 

 
Keywords: শিকড়,A Story of A Brother,student politics,effects of student politics,story about student politics, sheekor, bangla story.



Please Signup to comment on this article